১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং রবার্ট ক্লাইভকে অর্থ সাহায্য করার পিছনে জগৎ শেঠদের (মহাতাব চাঁদ ও তাঁর জ্ঞাতি ভাই স্বরূপ চাঁদ) মূল উদ্দেশ্য বাংলা বিজয়ে ইংরেজদের সাহায্য করা ছিল না। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের এই সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়েছিল নিজস্ব আর্থিক অস্তিত্ব রক্ষা, সরাসরি ব্যক্তিগত অপমান এবং তৎকালীন দরবারি রাজনীতির চরম সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে।
আঠারো শতকের সামন্ততান্ত্রিক ভারতে আধুনিক ‘জাতীয়তাবাদ’ বা স্বদেশপ্রেমের কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল না। তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক আনুগত্য নির্ধারিত হতো বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং শাসক-প্রজা সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। যে কারণগুলো বাংলার সবচেয়ে ধনী ব্যাংকিং হাউসকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে হাত মেলাতে বাধ্য করেছিল:
১. নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাত
১৭৫৬ সালে ২৩ বছর বয়সী সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার মসনদে বসার পর তাঁর উগ্র আচরণ ও সিদ্ধান্ত দরবারের প্রভাবশালী গোষ্ঠী, সামরিক বাহিনী এবং বণিক সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
- বিপুল অর্থদাবি: চরম আর্থিক সংকট ও সামরিক ব্যয়ের কারণে নবাব সিরাজ জগৎ শেঠদের কাছে ৩ কোটি টাকা (তৎকালীন সময়ে এক বিপুল অংক) দাবি করেন।
- প্রকাশ্য অপমান: মহাতাব চাঁদ এই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সিরাজ তাঁকে প্রকাশ্যে অপমান করেন এবং প্রহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনা শেঠ পরিবারের সম্মান ও প্রাণের ওপর সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে তাঁরা নবাবের কট্টর শত্রুতে পরিণত হন।
২. ব্যবসা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার পক্ষাঘাত
মুঘল সাম্রাজ্যের আর্থিক চালিকাশক্তি ছিল এই জগৎ শেঠ পরিবার। রাজ্য রাজস্ব স্থানান্তর, মুদ্রার টাঁকশাল পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক ঋণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতেন তাঁরাই।
- ১৭৫৬ সালে সিরাজের কলকাতা আক্রমণ ও চরম আগ্রাসী নীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
- মুদ্রার মান নেমে যাওয়ার ফলে শেঠদের মূল ব্যাংকিং ব্যবসা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। তাঁদের কাছে একজন অস্থির ও শত্রুভাবাপন্ন শাসক ছিলেন ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
৩. 'সিংহাসন পরিবর্তন'-এর পুরনো কৌশল
মুরশিদাবাদের দরবারে অর্থবলে শাসক পরিবর্তন করা জগৎ শেঠদের জন্য নতুন কিছু ছিল না।
- ১৭৪০ সালে তাঁরা তৎকালীন নবাব সরফরাজ খানকে উৎখাত করে আলীবর্দী খানকে (সিরাজের মাতামহ) মসনদে বসাতে বিশাল অর্থের যোগান দিয়েছিলেন।
- একজন অনিয়ন্ত্রিত শাসককে সরিয়ে অনুগত কাউকে মসনদে বসানো তাঁদের কাছে একটি পরিচিত ব্যবসায়িক কৌশল ছিল। ফলে, মীর জাফর ও রায় দুর্লভের মতো অসন্তুষ্ট সেনাপতিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁরা মীর জাফরকে মসনদে বসানোর পরিকল্পনা করেন, যাতে দরবারে স্থিতিশীলতা ফেরে এবং তাঁদের ব্যবসা সুরক্ষিত থাকে।
৪. ইংরেজদের 'ভাড়াটে সৈনিক' মনে করার ভুল
জগৎ শেঠ রবার্ট ক্লাইভ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কোনো হবু শাসক মনে করেননি; বরং তাঁদের কেবল একটি 'ভাড়াটে সামরিক শক্তি' হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, যারা অভ্যুত্থানটি ঘটাতে পারবে।
- তাঁরা ক্লাইভের সামরিক অভিযানের খরচ জুগিয়েছিলেন এবং মীর জাফরের বাহিনীকে ঘুষ দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন।
- শেঠদের ধারণা ছিল, সিরাজ অপসারিত হলে মীর জাফর নতুন নবাব হবেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য আগের নিয়মেই চলবে। আর ইংরেজরা থেকে যাবে আগের মতোই সাধারণ বণিক হিসেবে—যারা ট্যাক্স দেবে এবং ঋণের সুদ মেটাবে।
ঐতিহাসিক ভুল হিসেব: আশা ও বাস্তবতা
| জগৎ শেঠ যা আশা করেছিলেন | বাস্তবে যা ঘটেছিল |
| সিরাজকে সরিয়ে মীর জাফরের মতো অনুগত পুতুল শাসক বসানো। | ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বণিক থেকে বাংলার প্রকৃত শাসকে পরিণত হয়। |
| বাংলার রাজকোষ ও টাঁকশালের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখা। | ১৭৬৫ সালে ইংরেজরা 'দেওয়ানি' লাভ করে এবং রাজস্ব আদায়ের কেন্দ্র কলকাতায় সরিয়ে নেয়। |
| দরবারে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা। | ১৭৬৩ সালে নবাব মীর কাসিম দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মহাতাব চাঁদ ও স্বরূপ চাঁদকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে শেঠদের বিপুল সম্পত্তি ও প্রভাব দ্রুত বিলুপ্ত হয়। |
মূল্যায়ন: জগৎ শেঠরা বাংলাকে কোনো বিদেশী শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্লাইভকে অর্থ দেননি। তাঁরা চেয়েছিলেন অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা দরবারি ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে। কিন্তু মর্মান্তিক ইতিহাস হলো, যে শক্তিকে তাঁরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, সেই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার হাতেই পরবর্তীতে তাঁদের নিজেদের সাম্রাজ্য চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।


