ভিউজ নাও স্পোর্টস ডেস্ক | বিশ্বকাপ বিশেষ
গুয়াদালাহারা, মেক্সিকো: বিশ্বকাপের মঞ্চে লড়াই, প্রত্যাবর্তন এবং আবেগ—এই তিনের মিশেলে এক স্মরণীয় জয় তুলে নিল দক্ষিণ কোরিয়া। মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার ঐতিহাসিক এস্তাদিও গুয়াদালাহারা (এস্তাদিও আক্রন) স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এ’-এর ম্যাচে চেকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে দুর্দান্ত সূচনা করল এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল দক্ষিণ কোরিয়া।
প্রথমার্ধে দুই দলই বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও গোলের দেখা মেলেনি। তবে ম্যাচের ৫৯ মিনিটে চেকিয়ার অধিনায়ক লাডিস্লাভ ক্রেইচি ভ্লাদিমির কৌফালের নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে গোল করে ইউরোপীয় দলকে এগিয়ে দেন। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল দীর্ঘ ২০ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা চেকিয়াই হয়তো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে।
কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রত্যাবর্তনের গল্প।
মিডফিল্ডের জাদুকর হুয়াং ইন-বম
৬৭ মিনিটে হুয়াং ইন-বম ম্যাচে সমতা ফেরান। মাঝমাঠ থেকে পুরো ম্যাচ জুড়ে অসাধারণ ছন্দে খেলেছেন এই মিডফিল্ডার। লি কাং-ইনের দুর্দান্ত পাস থেকে গোল করে তিনি শুধু স্কোরলাইন সমান করেননি, কোরিয়ার আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনেন।
হুয়াং ইন-বম বর্তমানে ইউরোপীয় ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত এক নাম। তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ, খেলার গতি নির্ধারণ এবং আক্রমণ গড়ে তোলার দক্ষতা এদিনও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ম্যাচ শেষে অনেক বিশ্লেষকই তাঁকে কোরিয়ার "ইঞ্জিন রুম" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
নায়ক ও হিউন-গিউ: নতুন প্রজন্মের বার্তা
ম্যাচের ৮০ মিনিটে আসে নির্ণায়ক মুহূর্ত। বদলি হিসেবে নামা তরুণ স্ট্রাইকার ও হিউন-গিউ (Oh Hyun-Gyu) সুযোগ কাজে লাগিয়ে জয়সূচক গোলটি করেন। ২৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বর্তমানে তুরস্কের বেসিকতাস ক্লাবে খেলেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ভবিষ্যৎ স্ট্রাইকিং ভরসা হিসেবে বিবেচিত।
কয়েক বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে আলোড়ন তোলা চো গ্যু-সুং এবার দলে নেই। দীর্ঘ চোট এবং পুনর্বাসনের কারণে তিনি বিশ্বকাপ মিস করেছেন। সেই শূন্যস্থান পূরণের দায়িত্ব এখন ও হিউন-গিউর কাঁধে। আর বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই জয়সূচক গোল করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন নায়ক উঠে আসছে।
সন হিউং-মিন: গোল না করেও নেতৃত্বের ছাপ
স্কোরশিটে নাম না থাকলেও অধিনায়ক সন হিউং-মিন ছিলেন দলের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। টটেনহ্যাম হটস্পারের এই তারকা ফরোয়ার্ড বারবার আক্রমণ সাজিয়েছেন, ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রেখেছেন এবং সতীর্থদের উজ্জীবিত করেছেন।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা কোরিয়ান সমর্থকদের কাছে সন শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি প্রজন্মের প্রতীক। ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে হাজারো কোরিয়ান সমর্থকের উল্লাস যেন সেই আবেগকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এল।
কৌশলগত বিশ্লেষণ: প্রেসিংয়ে জয়
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়ের মূল চাবিকাঠি ছিল তাদের উচ্চ-গতির প্রেসিং ফুটবল। প্রতিপক্ষের মাঝমাঠে চাপ সৃষ্টি করে বারবার বল কেড়ে নেওয়া, দ্রুত ট্রানজিশন এবং দুই উইং ব্যবহার করে আক্রমণ—এই কৌশল চেকিয়াকে বেশ ভুগিয়েছে।
তবে কিছু দুর্বলতাও সামনে এসেছে। বেশ কয়েকটি নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করেছে কোরিয়ার আক্রমণভাগ। এছাড়া শারীরিক শক্তির লড়াইয়ে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে কিছুটা পিছিয়ে পড়ার ছবিও দেখা গেছে। নকআউট পর্বে এগোতে হলে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।
বিশ্বকাপে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
এই জয়ের ফলে গ্রুপ ‘এ’-তে গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট অর্জন করল দক্ষিণ কোরিয়া। একই গ্রুপে রয়েছে সহ-আয়োজক মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। ফলে পরবর্তী ম্যাচগুলো আরও কঠিন হতে চলেছে।
তবে প্রথম ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কোরিয়া, তাতে স্পষ্ট—এই দল শুধু প্রতিভাবান নয়, মানসিকভাবেও দৃঢ়। আর বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে অনেক সময় সেই মানসিক শক্তিই সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে।
ফলাফল: দক্ষিণ কোরিয়া ২-১ চেকিয়া
গোলদাতা:
- লাডিস্লাভ ক্রেইচি (৫৯') – চেকিয়া
- হুয়াং ইন-বম (৬৭') – দক্ষিণ কোরিয়া
- ও হিউন-গিউ (৮০') – দক্ষিণ কোরিয়া
স্টেডিয়াম: এস্তাদিও গুয়াদালাহারা (এস্তাদিও আক্রন), গুয়াদালাহারা, মেক্সিকো
দর্শক ধারণক্ষমতা: ৪৫,৬৬৪
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়ে দিল—এশিয়ার পতাকা উড়িয়ে রাখার লড়াইয়ে তারা এবারও প্রস্তুত।






