![]() |
কলকাতা, ২০ জুন: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত অধ্যায় হল ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলা’ বা ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল’ প্রস্তাব। যখন ভারত ও পাকিস্তান গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন বাংলাকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ না করে এক ও অভিন্ন রাখার পক্ষে সরব হয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসু।
শরৎচন্দ্র বসুর মতে, বাংলা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়, বরং ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে বাংলাকে ভাগ করা হলে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
১৯৪৭ সালের এপ্রিল-মে মাসে শরৎচন্দ্র বসু একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলার প্রস্তাব সামনে আনেন। এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতা আবুল হাশিম এবং কংগ্রেস নেতা কিরণশঙ্কর রায়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বাংলাকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বজায় রাখা এবং ধর্মভিত্তিক দেশভাগের বিকল্প পথ খুঁজে বের করা।
ইতিহাসবিদদের মতে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সরাসরি ১৯৪৭ সালের এই প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, কারণ তিনি ১৯৪৫ সালের পর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে অনুপস্থিত ছিলেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরোধী এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে। সেই কারণে অনেকেই মনে করেন, ঐক্যবদ্ধ বাংলার ধারণা নেতাজির বৃহত্তর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা সফল হয়নি। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশ, বিশেষত জওহরলাল নেহরু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, এই প্রস্তাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। অন্যদিকে মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় নেতৃত্বও পাকিস্তান গঠনের লক্ষ্যে অটল ছিল। ফলে ঐক্যবদ্ধ বাংলার স্বপ্ন রাজনৈতিক সমর্থনের অভাবে বাস্তবায়িত হতে পারেনি।
১৯৪৭ সালের আগস্টে দেশভাগের মাধ্যমে বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হয়—ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গ, যা পরে পূর্ব পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে পরিণত হয়।
আজও ঐক্যবদ্ধ বাংলার প্রস্তাব ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে দেশভাগের এক গুরুত্বপূর্ণ ‘বিকল্প সম্ভাবনা’ হিসেবে আলোচিত হয়। অনেকের মতে, এটি ছিল ধর্মের পরিবর্তে ভাষা ও আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক সাহসী রাজনৈতিক উদ্যোগ।


