ভিউজ নাও বিশেষ প্রতিবেদন
২০ জুন, ২০২৬
"পশ্চিমবঙ্গ দিবস" ঘিরে প্রতিবছরই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। বিজেপি ও আরএসএসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় না থাকলে পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্বই থাকত না। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এমন এক ইতিহাস, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের জন্মকে একজন ব্যক্তির কৃতিত্ব হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু ইতিহাস কি এত সরল?
১৯৪৭ সালের ২০ জুন অবিভক্ত বাংলার আইনসভায় অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক ভোটাভুটি নিয়ে যত গভীরে যাওয়া যায়, ততই স্পষ্ট হয় যে পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি ছিল বহু রাজনৈতিক শক্তি, বহু মতাদর্শ এবং বহু ব্যক্তির সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ফল। আর সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে রয়েছেন দুই কমিউনিস্ট প্রতিনিধি— জ্যোতি বসু এবং রতনলাল ব্রাহ্মণ।
দেশভাগের আগুনে জ্বলছে বাংলা
১৯৪৭ সালের প্রথমার্ধ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন আসন্ন। ভারত স্বাধীনতার পথে এগোচ্ছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে দেশভাগের বিভীষিকা। বাংলার সামনে তখন তিনটি সম্ভাবনা ছিল—
- গোটা বাংলা পাকিস্তানে যাবে।
- বাংলা ভাগ হয়ে পশ্চিমাংশ ভারতের সঙ্গে থাকবে।
- অথবা স্বাধীন ও যুক্ত বাংলা গঠিত হবে।
এই সময় বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা মত, নানা পরিকল্পনা এবং তীব্র বিতর্ক চলছিল। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ফরোয়ার্ড ব্লক— প্রত্যেকের নিজস্ব অবস্থান ছিল।
কমিউনিস্ট পার্টির বড় অংশ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের বিরোধিতা করেছিল। তাদের অবস্থান ছিল, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বদলে বাঙালির ঐক্য রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছিল। দেশভাগ প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।
২০ জুন ১৯৪৭: ইতিহাসের সেই দিন
সেদিন অবিভক্ত বাংলার আইনসভায় ভোটাভুটি হয় পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ হিসেবে গঠনের প্রশ্নে।
প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ৫৮টি।
এই ৫৮ ভোটের মধ্যেই ছিল দুই কমিউনিস্ট প্রতিনিধির ভোট—
জ্যোতি বসু এবং রতনলাল ব্রাহ্মণ।
তাঁরা ছিলেন একমাত্র দুই কমিউনিস্ট সদস্য, যারা পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে ভোট দেন।
আজকের রাজনৈতিক বিতর্কে এই তথ্য প্রায়ই আড়ালে চলে যায়।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো— এই ভোটগুলো বাদ দিলে ফলাফলের সমীকরণ ভিন্ন হতে পারত। পশ্চিমবঙ্গের জন্মের ইতিহাসে তাই এই দুই কমিউনিস্ট নেতার অবদান অস্বীকার করা যায় না।
কেন এই ভোট গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
আরএসএস-বিজেপির প্রচারে প্রায়ই এমন ধারণা দেওয়া হয় যে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের প্রশ্নে সমস্ত কৃতিত্ব এককভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের।
বাস্তবে রাজনৈতিক প্রস্তাব কোনও ব্যক্তির বক্তৃতা দিয়ে নয়, আইনসভার ভোটে পাশ হয়।
সেই ভোটে সমর্থন দিয়েছিলেন বিভিন্ন মতাদর্শের প্রতিনিধি। কমিউনিস্টদের মধ্যেও দুই নেতা রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেন।
তাঁদের সিদ্ধান্ত ছিল না সাম্প্রদায়িকতার প্রতি সমর্থন; বরং বাংলার জনগণের ভবিষ্যৎ, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে নেওয়া এক কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
জ্যোতি বসু: ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া
১৯৪৭ সালে জ্যোতি বসুর বয়স ছিল মাত্র তিরিশের কোঠায়। তিনি তখন শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম মুখ।
রেল শ্রমিক কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত এই তরুণ নেতা পরবর্তীকালে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী বামপন্থী রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন।
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার গঠনের পর তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন এবং টানা ২৩ বছর রাজ্যের নেতৃত্ব দেন।
ভূমি সংস্কার, অপারেশন বর্গা, পঞ্চায়েত গণতন্ত্র, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কিন্তু তারও বহু আগে, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন তিনি এমন এক ভোট দিয়েছিলেন যা পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
রতনলাল ব্রাহ্মণ: ইতিহাসের বিস্মৃত নায়ক
জ্যোতি বসুর নাম ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
কিন্তু রতনলাল ব্রাহ্মণের নাম আজ প্রায় বিস্মৃত।
দার্জিলিংয়ের এই কমিউনিস্ট নেতা সেই ঐতিহাসিক দিনে জ্যোতি বসুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গ গঠনের প্রশ্নে তাঁর ভোটও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইতিহাসের আলোচনায় প্রায়ই তাঁকে উপেক্ষা করা হয়, অথচ পশ্চিমবঙ্গের জন্মকাহিনিতে তাঁর নামও সমানভাবে স্মরণীয় হওয়া উচিত।
ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা
বর্তমান সময়ে ইতিহাসকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক লড়াই তৈরি হয়েছে।
আরএসএস-বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ করতে চায়। অন্যদিকে বামপন্থীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস কোনও একক নেতা বা একক সংগঠনের সম্পত্তি নয়।
বাংলার ইতিহাস গড়ে উঠেছে স্বাধীনতা সংগ্রামী, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার সম্মিলিত অবদানে।
যদি জ্যোতি বসু ও রতনলাল ব্রাহ্মণের মতো নেতারা সেই সময় নিজেদের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন না করতেন, তাহলে ইতিহাসের গতিপথ ভিন্নও হতে পারত।
পশ্চিমবঙ্গ: বহু সংগ্রামের ফসল
পশ্চিমবঙ্গের জন্ম শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা তৈরির ঘটনা নয়।
এটি উদ্বাস্তু মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার আন্দোলন, ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রামের সঙ্গেও জড়িত।
এই ইতিহাসকে যদি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের প্রচারে সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে প্রকৃত ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হবে।
ইতিহাসের কাছে আমাদের ঋণ
আজ পশ্চিমবঙ্গের ৭৯তম প্রতিষ্ঠা দিবসে ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—
পশ্চিমবঙ্গ কোনও একক নেতার সৃষ্টি নয়।
এই রাজ্য গড়ে উঠেছে বহু মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম, মতভেদ, সমঝোতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।
সেই ইতিহাসে যেমন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আছেন, তেমনই আছেন জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মণ এবং আরও বহু অজানা-অচেনা মানুষ।
ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার নয়, তথ্য ও সত্যের আলোয় দেখা— এটাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গের জন্মের ইতিহাস তাই কেবল একটি দলের নয়, সমগ্র বাংলার মানুষের ইতিহাস।


