নয়াদিল্লি, ১৮ জুন: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian ১৭ জুন একটি ঐতিহাসিক ১৪-দফা শান্তি চুক্তিতে ভার্চুয়ালি স্বাক্ষর করেছেন। এই সমঝোতার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে তাৎক্ষণিক পতন দেখা গেলেও, ভারতীয় ভোক্তাদের জন্য পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এখনই কমছে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
চুক্তির ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৮-৮৯ ডলার থেকে নেমে ৮৩ ডলারের আশেপাশে চলে আসে। একইভাবে মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডও ৮৫ ডলারের নিচে নেমে যায়। এর মূল কারণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি হ্রাস পাওয়া।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল পুনরুদ্ধারের খবর বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা কমেছে এবং এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারেও উত্থান লক্ষ্য করা গেছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও ভারতের পাম্পে সেই প্রভাব পৌঁছাতে সময় লাগবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে অনেক তেলবাহী জাহাজ আটকে ছিল, বিভিন্ন বন্দরে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ব্যাকলগ। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং হরমুজ প্রণালী থেকে সামুদ্রিক মাইন অপসারণের কাজও এখনও বাকি।
ভারতের অর্থনীতি গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই সংকটের চাপ বহন করেছে। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ৭.৩৮ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৭.৫২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহণ, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও। একই সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিও বেড়েছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই শান্তি চুক্তি না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল। সেই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকোচনের মুখে পড়ত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন মন্দার দিকে এগিয়ে যেতে পারত।
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। এর ফলে ইরান আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে এবং আগামী ১-২ বছরের মধ্যে তাদের তেল রপ্তানি দৈনিক প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
১৪-দফা সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে টোল-মুক্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সহায়তা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। পাশাপাশি তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আন্তর্জাতিক সীমার মধ্যে আনা হবে এবং পুরো কর্মসূচি পরিচালিত হবে International Atomic Energy Agency-এর কঠোর তত্ত্বাবধানে।
চুক্তিটি আপাতত একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (MoU) হিসেবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে উভয় দেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক কর্মসূচির চূড়ান্ত কাঠামো এবং অন্যান্য জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা চালাবে। আলোচনায় সফলতা এলে আগস্টের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুফল হবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা। তবে ভারতীয় গ্রাহকদের পেট্রোল-ডিজেলের দামে বাস্তব স্বস্তি পেতে হলে আন্তর্জাতিক মূল্যহ্রাসের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে তাই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও দেশের পাম্পে জ্বালানির দাম কমার সম্ভাবনা এখনও কিছুটা সময়সাপেক্ষ।


