৫২ বছর পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে এসে ইতিহাসের সাক্ষী থাকল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়ে ১-১ গোলে ড্র করে কঙ্গোর ‘লেপার্ডস’ শুধু একটি পয়েন্টই অর্জন করেনি, বরং বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসও।
১৮৮৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত কঙ্গো ছিল বেলজিয়ামের নির্মম উপনিবেশ। সেই সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ শোষণ, নির্যাতন এবং লুটের শিকার হন। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্যাট্রিস লুমুম্বা। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা লাভ করে কঙ্গো এবং তিনি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু স্বাধীনতার পরও বহুজাতিক শক্তি ও পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক স্বার্থ কঙ্গোর উপর থেকে সরেনি।
ঔপনিবেশিক যুগে রাবার, পরে তামা, হীরা ও ইউরেনিয়াম—প্রতিটি সম্পদই বিশ্বের শিল্পায়নকে সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ির যুগে কঙ্গোর কোবাল্ট হয়ে উঠেছে নতুন ‘নীল সোনা’। পৃথিবীর মোট কোবাল্টের প্রায় ৭০ শতাংশ মজুত রয়েছে কঙ্গোতে। এই কোবাল্টই ব্যবহৃত হয় বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরিতে, যার মধ্যে রয়েছে Tesla-র গাড়িগুলিও
তবে এই সম্পদের বিপুল ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও কঙ্গোর সাধারণ মানুষ আজও দারিদ্র্য, অস্থিরতা ও শোষণের শিকার। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বহুবার কঙ্গোর খনিগুলিতে শিশুশ্রম, অতি কম মজুরি এবং বিপজ্জনক কর্মপরিবেশের অভিযোগ তুলে ধরেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপে কঙ্গোর প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া ঘটনা নয়, বরং একটি প্রতীকী মুহূর্ত। যে দেশে বিশ্বের প্রযুক্তি ও শিল্পের জন্য অপরিহার্য খনিজ সম্পদ রয়েছে, সেই দেশের ফুটবলাররা আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরছেন।
পর্তুগালের বিরুদ্ধে ম্যাচে ২৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড উইসার দুর্দান্ত হেডারে গোল করে কঙ্গোকে এগিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হলেও কঙ্গোলিজ সমর্থকদের কাছে এই ফলাফল জয়ের সমান। কারণ বিশ্বমঞ্চে ফিরে এসে তারা প্রমাণ করেছে, ইতিহাসের শোষণ ও বৈষম্য পেরিয়েও তাদের লড়াই থেমে নেই।
প্যাট্রিস লুমুম্বার স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বকাপের মঞ্চ—কঙ্গোর যাত্রা এখনও অসমাপ্ত। কিন্তু পর্তুগালের বিরুদ্ধে এই গোল এবং মূল্যবান ড্র নিঃসন্দেহে কঙ্গোর মানুষের কাছে গর্ব, আত্মমর্যাদা এবং আশার এক নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে।



