" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory ইতিহাসে ফিরে দেখা: ২৪ জুন ১৯৮০—এল সালভাদরের সেই রক্তঝরা দিন এবং একটি ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণ //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

ইতিহাসে ফিরে দেখা: ২৪ জুন ১৯৮০—এল সালভাদরের সেই রক্তঝরা দিন এবং একটি ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণ

 


লাতিন আমেরিকার ইতিহাস মানেই যেন এক দীর্ঘ সংগ্রাম, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের রুখে দাঁড়ানো এবং অধিকার আদায়ের রক্তক্ষয়ী লড়াই। এই ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৮০ সালের ২৪ জুন তারিখটি আমাদের সামনে এক অভূতপূর্ব এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে হাজির হয়। আজ থেকে ঠিক ৪৬ বছর আগে, এই দিনে এল সালভাদরের বুকে নেমে এসেছিল এক ঐতিহাসিক গণজোয়ার, যা দেশটির শাসনদণ্ড নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং চিরতরে বদলে দিয়েছিল লাতিন আমেরিকার এই ছোট্ট দেশটির রাজনৈতিক ভূগোল।

চলুন, ইতিহাসের আলো-ছায়ায় ফিরে যাওয়া যাক ১৯৮০ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে।

১. পটভূমি: যে ক্ষোভের আগুনে পুড়ছিল এল সালভাদর

১৯৮০ সালের শুরুতে এল সালভাদরের পরিস্থিতি ছিল একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারত। দেশটির ক্ষমতা তখন কুক্ষিগত ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এক নিষ্ঠুর সামরিক জান্তা সরকারের হাতে। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার বলতে কিছুই ছিল না।

দেশটির এই চরম অস্থিতিশীলতার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ ছিল:

  • অর্থনৈতিক বৈষম্য: দেশের সিংহভাগ জমি ও সম্পদ ছিল মাত্র কয়েকটি ধনাঢ্য পরিবারের হাতে, আর সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা বাস করত চরম দারিদ্র্যের মধ্যে।

  • নির্বাচনী জালিয়াতি: যখনই সাধারণ মানুষ ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে চেয়েছে, তখনই সামরিক সরকার জালিয়াতি করে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে।

  • রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস: সরকারের নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তার ওপর নেমে আসত নির্মম অত্যাচার। সরকারি মদদপুষ্ট গোপন ঘাতক বাহিনী বা 'ডেথ স্কোয়াড' (Death Squads) প্রতিদিন নির্বিচারে হত্যা করছিল বিরোধী দলীয় নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শ্রমিক কর্মীদের।

২. আর্চবিশপ ওস্কার রোমেরো হত্যাকাণ্ড: ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার মুহূর্ত

এই দীর্ঘস্থায়ী দমন-পীড়ন চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৮০ সালের ২৪ মার্চ। এল সালভাদরের সাধারণ মানুষের অধিকার এবং গরিব-দুঃখীদের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর ছিলেন আর্চবিশপ ওস্কার রোমেরো (Archbishop Óscar Romero)। তিনি চার্চের ভেতরে পবিত্র মাস (Mass) চলাকালীন সময়েই আততায়ীর বুলেটের আঘাতে নিহত হন।

একজন ধর্মীয় ও মানবিক নেতাকে এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করায় সালভাদরের সাধারণ মানুষের মনের ভয় এক নিমেষে ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। আন্তর্জাতিক মহলেও এই ঘটনা তীব্র নিন্দার ঝড় তোলে। মানুষ বুঝতে পারে, এই স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায়—ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।

৩. ২৪ জুনের সেই ঐতিহাসিক সকাল: থমকে গেল দেশ

এই তীব্র ক্ষোভকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দিতে দেশের সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র সংগঠন এবং কৃষক আন্দোলনগুলো এক ছাতার নিচে চলে আসে। জন্ম নেয় এক বিশাল রাজনৈতিক মোর্চা—'ডেমোক্রেটিক রেভোলিউশনারি ফ্রন্ট' (FDR)। এই এফডিআর-এর পক্ষ থেকেই ২৪ জুন দেশব্যাপী এক ঐতিহাসিক সাধারণ ধর্মঘটের (General Strike) ডাক দেওয়া হয়।

১৯৮০ সালের ২৪ জুন সকালে যেন এক নতুন এল সালভাদরের জন্ম হলো:

  • ৯০% মানুষের অংশগ্রহণ: দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো এত বড় স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ার দেখা যায়নি। সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কারখানার শ্রমিক, বাজারের বিক্রেতা, বাস চালক, স্কুলের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র—সবাই কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসেন। আনুমানিক ৯০ শতাংশ মানুষ এই ধর্মঘটে শামিল হন।

  • অর্থনৈতিক অচলবস্থা: রাজধানী সান সালভাদরসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলো সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। কলকারখানার চাকা বন্ধ হয়ে যায়, দোকানপাটের সাটার নেমে যায় এবং গণপরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

  • গ্রাম ও শহরের মেলবন্ধন: এই ধর্মঘটের বিশেষত্ব ছিল যে, এটি কেবল শহুরে বুদ্ধিজীবী বা শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এফডিআর-এর সহযোগী কৃষক সংগঠনগুলোর কল্যাণে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কৃষকরাও লাঙল ফেলে এই আন্দোলনে যোগ দেন।

৪. বুলেটের বনাম ব্যালট: জান্তা সরকারের নৃশংসতা

স্বাভাবিকভাবেই, সামরিক সরকার এই বিশাল জনস্রোত দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ধর্মঘট ব্যর্থ করতে এবং শহরগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা রাস্তায় রাস্তায় সাঁজোয়া যান এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনা মোতায়েন করে।

বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছোঁড়া হয়। বহু কর্মীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ভয়ভীতি দেখানো হয়। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো—জনগণের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বুলেটের ভয় আর কাজ করে না। সালভাদরের মানুষ সেদিন সেনানিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করে রাজপথ দখল করে রেখেছিল। এই ধর্মঘট প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, সামরিক জান্তার পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে।

৫. একটি ঐতিহাসিক মোড়: রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে সশস্ত্র সংগ্রাম

২৪ জুনের এই সফল ধর্মঘট এল সালভাদরের বামপন্থী আন্দোলনের কৌশলগত দিক দিয়ে এক বিরাট টার্নিং পয়েন্ট বা মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা ছিল। এফডিআর (FDR)-এর নেতারা বুঝতে পারেন যে, কেবল শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা ধর্মঘট দিয়ে এই রক্তপিপাসু সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না।

এর ফলে, রাজনৈতিক মোর্চা এফডিআর দেশের পাঁচটি প্রধান সশস্ত্র গেরিলা সংগঠনের জোট 'ফারাবুন্দো মার্তি ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট' (FMLN)-এর সাথে হাত মেলায়।

  • এর মাধ্যমে একদিকে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং অন্যদিকে গেরিলাদের সামরিক কৌশল—এই দুই ধারা মিলে এক সুসংহত ও শক্তিশালী বিরোধী ফ্রন্ট গড়ে ওঠে।

  • এই ঐতিহাসিক জোটের হাত ধরেই পরবর্তী সময়ে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।

৬. দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত এবং ইতিহাসের শিক্ষা

এই ২৪ জুনের ধর্মঘটের পরই এল সালভাদরে আনুষ্ঠানিকভাবে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ (Civil War) শুরু হয়, যা স্থায়ী হয়েছিল দীর্ঘ ১২ বছর। ১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক 'চাপুলতেপেক শান্তি চুক্তি' (Chapultepec Peace Accords)-র মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই ১২ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রায় ৭৫,০০০ মানুষ প্রাণ হারান, হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হন এবং দেশের এক-চতুর্থাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হন।

 আজ ৪৬ বছর পর ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকালে বোঝা যায়, ১৯৮০ সালের ২৪ জুনের সেই সাধারণ ধর্মঘট কেবল একটি দিনের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল এল সালভাদরের শোষিত মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার তীব্র ঘোষণা। ইতিহাসের এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বৈরাচারের শক্তি যতই অসীম মনে হোক না কেন, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির সামনে তা একদিন ধূলিসাৎ হতে বাধ্য।

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies