শংকর পাল
আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হতে চলেছে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম প্রতীক্ষিত লড়াই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মুখোমুখি হবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কো। ভারতীয় সময় রবিবার ভোর ৩:৩০ মিনিটে শুরু হবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ।
এই ম্যাচ শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, বরং এটি দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে ব্রাজিলের ঐতিহ্য, আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। অন্যদিকে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়া মরক্কোর আরও বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষা।
ভিনিসিয়ুসের কাঁধে ব্রাজিলের স্বপ্ন
নেইমারের অনুপস্থিতিতে এবার ব্রাজিলের আক্রমণের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন ২৬ বছর বয়সি ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। বিশ্বকাপ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ব্যক্তিগত পুরস্কার বা ব্যক্তিগত কৃতিত্ব তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ভিনিসিয়ুস বলেন,
"আমি এমভিপি হতে আসিনি। আমি এসেছি ব্রাজিলকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এনে দিতে। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হওয়া আমার লক্ষ্য নয়, ব্রাজিলকে আবার বিশ্বের শীর্ষে ফিরিয়ে আনা আমার লক্ষ্য।"
তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয়—দলগত সাফল্য। গোল, অ্যাসিস্ট বা ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান নয়, ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন,
"আমরা এখানে বিশ্বকাপ জিততে এসেছি। এর বাইরে আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটাই আমাদের একমাত্র মিশন।"
কাতারের ক্ষত এখনো তাজা
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে পরাজয় আজও তাড়া করে বেড়ায় ব্রাজিলকে। সেই ব্যথা ভুলতে পারেননি ভিনিসিয়ুসও।
তাঁর কথায়,
"গত বিশ্বকাপ আমাদের শিখিয়েছে যে শেষ বাঁশি বাজার আগে কিছুই নিশ্চিত নয়। আমরা অনেক শিক্ষা পেয়েছি এবং এবার ভিন্নভাবে সবকিছু করতে চাই।"
এই মানসিকতাই ব্রাজিল শিবিরে নতুন একাগ্রতা তৈরি করেছে। ভিনিসিয়ুসের মতে, বিশ্বকাপ তাদের জন্য শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। ম্যাচের আগের দিন নয়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই দল নিজেদের প্রস্তুত করেছে চূড়ান্ত লক্ষ্য সামনে রেখে।
আনচেলত্তির ব্রাজিল
এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত কোচিং বেঞ্চে। কিংবদন্তি ইতালীয় কোচ Carlo Ancelotti প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ভিনিসিয়ুস, যিনি ক্লাব ফুটবলেও আনচেলত্তির অধীনে খেলেছেন, জানিয়েছেন—
"আনচেলত্তি আমাকে স্বাধীনতা দেন। তিনি আত্মবিশ্বাস দেন এবং শান্ত পরিবেশ তৈরি করেন। তাঁর অধীনে খেললে নিজের সেরাটা দেওয়া সহজ হয়।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, আনচেলত্তির কৌশলগত অভিজ্ঞতা ব্রাজিলকে এই বিশ্বকাপে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
মরক্কো আর আন্ডারডগ নয়
অন্যদিকে মরক্কোর অধিনায়ক Achraf Hakimi স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা আর নিজেদের আন্ডারডগ মনে করেন না।
২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছে আফ্রিকার ইতিহাস বদলে দিয়েছিল মরক্কো। এবার সেই সাফল্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য তাদের।
হাকিমি বলেন,
"কেন আমরা কাতারের চেয়েও ভালো করতে পারব না? আমরা প্রস্তুত। আমাদের লক্ষ্য যতদূর সম্ভব এগিয়ে যাওয়া।"
তিনি আরও বলেন,
"আমাদের সীমা আমরা নিজেরাই ঠিক করি। আমরা আর নিজেদের আন্ডারডগ হিসেবে দেখি না।"
এই আত্মবিশ্বাসই মরক্কোকে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ করে তুলেছে।
ভিনিসিয়ুস বনাম হাকিমি: ম্যাচের সবচেয়ে বড় দ্বৈরথ
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং আক্রাফ হাকিমির সরাসরি লড়াই।
একদিকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম এবং সৃজনশীল আক্রমণভাগের খেলোয়াড় ভিনিসিয়ুস। অন্যদিকে পিএসজির তারকা ডানপ্রান্তের ডিফেন্ডার হাকিমি, যিনি আক্রমণ এবং রক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই সমান দক্ষ।
হাকিমি জানিয়েছেন,
"ভিনিসিয়ুস অসাধারণ ফুটবলার। কিন্তু তাকে থামাতে একজন খেলোয়াড় যথেষ্ট নয়। পুরো দলকে একসঙ্গে রক্ষণ করতে হবে।"
এই লড়াই ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাস পুনর্লিখনের স্বপ্ন
ভিনিসিয়ুসের একটি বক্তব্য ইতিমধ্যেই ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন,
"আর মাত্র আটটি ম্যাচ। এই আটটি ম্যাচ আমাদের দেশের ইতিহাস নতুন করে লিখতে পারে।"
ব্রাজিল ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ষষ্ঠ তারকা জার্সিতে যোগ করার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামছে সেলেসাওরা।
অন্যদিকে মরক্কো চাইছে প্রমাণ করতে যে ২০২২ সালের সাফল্য কোনও দুর্ঘটনা ছিল না। আফ্রিকান ফুটবলের নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া তারা।
চোখ থাকবে সারা বিশ্বের
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ব্রাজিল ষষ্ঠ এবং মরক্কো অষ্টম স্থানে। দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, তারকা খেলোয়াড়দের উপস্থিতি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে এটি গ্রুপ পর্বের অন্যতম সেরা ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশ্বকাপের দীর্ঘ পথচলা শুরু করতে যাচ্ছে ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুসের চোখে শুধু একটি স্বপ্ন—বিশ্বকাপ ট্রফি। আর মরক্কোর লক্ষ্য বিশ্বকে আবার চমকে দেওয়া।
কয়েক মুহূর্ত পরই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলোয় শুরু হবে সেই লড়াই, যেখানে ইতিহাস, স্বপ্ন, গৌরব এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছু একসঙ্গে মিশে যাবে ৯০ মিনিটের ফুটবলে।


