লাল সেলাম কমরেড নিরাজয় ত্রিপুরা
আগরতলা, ২১ জুন ২০২৬: ত্রিপুরার বামপন্থী আন্দোলন, আদিবাসী জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। সিপিআই(এম)-এর প্রবীণ নেতা, প্রাক্তন বিধায়ক এবং আদিবাসী সমাজের শ্রদ্ধেয় জননেতা কমরেড নিরাজয় ত্রিপুরা ২১ জুন প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে শুধু ত্রিপুরাই নয়, সমগ্র বামপন্থী আন্দোলন গভীরভাবে শোকাহত।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নিরাজয় ত্রিপুরা নিজেকে কখনও ক্ষমতার রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন সংগ্রামের মানুষ, মাটির মানুষ, জনগণের মানুষ। পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে ঐক্যের সেতুবন্ধন গড়ে তোলা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১৯৩৯ সালের ১২ জুলাই জন্মগ্রহণকারী নিরাজয় ত্রিপুরা এমন এক সময়ে বেড়ে উঠেছিলেন, যখন উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার ছিল। সেই বাস্তবতা থেকেই তিনি মানুষের মুক্তির রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৬৭ সালে সিপিআই(এম)-এ যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সংগঠিত রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। এরপর কয়েক দশক ধরে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের একজন নির্ভরযোগ্য সংগঠক, সংগ্রামী নেতা এবং জননন্দিত মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ত্রিপুরার ধলাই জেলার লংথোরাই অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর নাম একাকার হয়ে গিয়েছিল। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের সঙ্গে তিনি নিজেকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছিলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভূমির অধিকার এবং কর্মসংস্থানের দাবিতে তিনি ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, ছিলেন পরিবারের একজন সদস্যের মতো আপনজন।
সেই কারণেই বহু মানুষ তাঁকে স্নেহ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে ডাকতেন— "লংথোরাইয়ের কমান্ডান্তে"। এই উপাধি কোনও আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পরিচয় নয়; বরং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অর্জিত এক বিরল সম্মান। পাহাড়ের গ্রামে গ্রামে, শ্রমজীবী মানুষের ঘরে ঘরে, কৃষকদের মধ্যে এবং আদিবাসী যুবসমাজের কাছে তিনি ছিলেন সংগ্রামের প্রতীক।
প্রাক্তন বিধায়ক হিসেবে তিনি বিধানসভায় জনগণের দাবি তুলে ধরেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল মাঠে-ময়দানে, মানুষের মধ্যে। নির্বাচনী রাজনীতির বাইরেও তিনি আজীবন সংগঠন গড়ে তোলা, নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করা এবং গণআন্দোলনের ভিত মজবুত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
ত্রিপুরার বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে নিরাজয় ত্রিপুরার নাম উচ্চারিত হবে এমন একজন নেতারূপে, যিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তাঁর সততা, সরল জীবনযাপন এবং মানুষের প্রতি অঙ্গীকারের প্রশংসা করেছেন বহুবার।
তাঁর প্রয়াণে ত্রিপুরার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সিপিআই(এম)-এর বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, নিরাজয় ত্রিপুরার সংগ্রামী জীবন, আদর্শ এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা আগামী দিনের আন্দোলনকে পথ দেখাবে।
আজ যখন দেশজুড়ে বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন নিরাজয় ত্রিপুরার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের গুরুত্ব।
তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন, তাঁর লড়াই এবং তাঁর আদর্শ বহন করে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মের ওপর। কমরেড নিরাজয় ত্রিপুরা হয়তো আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর সংগ্রামী চেতনা, তাঁর সাহস এবং মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা বেঁচে থাকবে হাজারো কর্মী-সমর্থকের হৃদয়ে।


