" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory রক্তে ভেজা ‘ফ্যান দে মা’: ১৯৫৯-এর খাদ্যের দাবি থেকে রাজপথের গণহত্যা //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

রক্তে ভেজা ‘ফ্যান দে মা’: ১৯৫৯-এর খাদ্যের দাবি থেকে রাজপথের গণহত্যা

 

31ST AUGUST MOVEMENT



বিশেষ প্রতিবেদন | ভিউস নাও

“এত ভাত ভাত করছে কেন ওরা? চাল না পেলে রুটি খেলেই তো পারে!”— তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রীর এই নির্মম, উদ্ধত উক্তিটি স্বাধীন ভারতের বুকে এক বিভৎস অসংবেদনশীলতার প্রতীক হয়ে থাকবে। যে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখে বাঙালি বুকের রক্ত দিয়েছিল, স্বাধীনতার মাত্র ১২ বছরের মাথায় সেই বাংলাতেই নেমে এসেছিল এক চরম ও নির্মম অন্ধকার। এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস নয়; এটি স্বাধীন দেশের সরকারের সহায়তায় তৈরি কৃত্রিম অনাহার, কালোবাজারি এবং এক ফোঁটা ফ্যানের জন্য হাহাকার করা বুভুক্ষু মানুষের রক্তের ইতিহাস।



১. ফ্যানের আশায় কঙ্কালের শোভাযাত্রা: কীভাবে তৈরি হলো এই হাহাকার?

দেশভাগের নির্মম অভিশাপ মাথায় নিয়ে তখন লক্ষ লক্ষ বাস্তুহারা মানুষ কলকাতার রাস্তায়। জীবিকার তাগিদে গ্রামবাংলা ও ভিন রাজ্য থেকে ছুটে আসা শত সহস্র শ্রমজীবী মানুষ তখন এক মুঠো ভাতের আশায় উদভ্রান্ত। কিন্তু ততদিনে ক্ষমতার আসনে বসা সরকার সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।

পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে রাখা সেই বিভৎস সত্যের দিকে নজর দিলে বুক শিউরে ওঠে:

  • উৎপাদন বাড়লেও উধাও অন্ন: ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে দেশে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন ৪ কোটি ৮০ লক্ষ টন থেকে লাফিয়ে বেড়ে হয়েছিল ৬ কোটি ১০ লক্ষ টন। অথচ বিষাদময় বাস্তবতা হলো, সরকারের গণবন্টন বা রেশন ব্যবস্থার খাদ্য সরবরাহ ৮০ লক্ষ টন থেকে একধাক্কায় কমিয়ে আনা হলো মাত্র ১৬ লক্ষ টনে!

  • দাম বাড়ল আড়াই গুণের বেশি: ১৯৫৬ সালেও যেখানে এক টাকায় পাওয়া যেত আড়াই কেজি চাল, ১৯৫৮ সালের শেষভাগে এসে সেই এক কেজি চালের দাম গিয়ে দাঁড়াল এক টাকায়।

জোদ্দার, আড়তদার আর অসাধু চালকল মালিকরা গোদামে চাল আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করল। সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে রাজকীয় নীরবতা পালন করল। গ্রামের পর গ্রাম থেকে হাজার হাজার বুভুক্ষু মানুষ অ্যালুমিনিয়ামের ভাঙা বাটি আর বাটি-সানকি হাতে কলকাতার রাজপথে ছুটে এলো। অলিগলিতে বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল একটাই করুণ আর্তনাদ— "একটু ফ্যান দে মা..."



২. ‘মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি’ এবং দাবানলের মতো জ্বলে ওঠা বাংলা

যখন মা তার ক্ষুধার্ত সন্তানকে এক মুঠো ভাত দিতে না পেরে ধুঁকে ধুঁকে মরছে, তখন গঠিত হলো 'মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি' (PIFRC)। জ্যোতি বসু, নিরঞ্জন সেনগুপ্ত, হেমন্তকুমার বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, হরেকৃষ্ণ কোঙার ও বিনয় চৌধুরীদের নেতৃত্বে গঠিত এই যৌথ মঞ্চের পেছনে এসে দাঁড়াল বাংলার অগুনতি ক্ষুব্ধ কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্র সমাজ।

১৯৫৯ সালের মে ও জুন মাস থেকে রাজপথ গরম হতে শুরু করল। ২৫শে জুন সারা বাংলা জুড়ে পালিত হলো ঐতিহাসিক হরতাল। ১৩ই জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘জেল ভরো’ আন্দোলনে মাত্র এক মাসের মধ্যে ১৬৩৪ জন রাজবন্দি হলেন। কিন্তু খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ ও রেশনের দাবিতে অনড় আন্দোলন থামানো গেল না।

প্রতিবাদের প্রথম স্ফুলিঙ্গ
১৫ জুন - ২৫ জুন, ১৯৫৯
কলকাতায় প্রথম কেন্দ্রীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং ২৫শে জুন সারা বাংলায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়।

জেল ভরো ও খাদ্য কনভেনশন
১৩ জুলাই - ৮ আগস্ট, ১৯৫৯
এক মাসে ১৬৩৪ জন গ্রেপ্তার। ৮ই আগস্ট অনুষ্ঠিত কনভেনশন থেকে মহাকরণ অভিযানের ডাক দেওয়া হয়।

কলকাতা রাজপথে গণহত্যা
৩১শে আগস্ট, ১৯৫৯
লালদীঘি ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে মিছিলের ওপর পুলিশের পৈশাচিক লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ।

ছাত্র ধর্মঘট ও প্রতিরোধ
১-৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৯
সারা বাংলা স্তব্ধ করে ছাত্র সমাজের প্রতিরোধ। রাজপথে ৩০টি জায়গায় গুলি চালায় পুলিশ।


৩. ৩১শে আগস্টের কৃষ্ণপক্ষ: লাঠির আঘাতে ভেসে গেল রাজপথ

৩১শে আগস্টের সকাল। সুদূর গ্রামবাংলা থেকে খালি পেটে, ছেঁড়া কাপড়ে, লাল ফিতে বাঁধা লাঠি হাতে হেঁটে আসা কৃষক, মেহনতি মানুষ আর কলকাতার ছাত্র-যুবরা এসে জড়ো হলেন কলকাতার শহীদ মিনার ময়দানে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সেই মিছিলে আওয়াজ উঠেছিল— "কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না!"

মিছিল যখন মহাকরণের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (বর্তমান মির্জা গালিব স্ট্রিট) সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছাল, ঠিক তখনই ওপর মহল থেকে নির্দেশ এলো দমনপীড়নের। স্বাধীন ভারতের পুলিশ সেদিন কোনো করুণা দেখায়নি। নিঃশব্দে, নির্বিচারে শুরু হলো মাথায় ও বুকে লাঠির আঘাত।

  • সরকারি বনাম বেসরকারি মৃত্যুর খতিয়ান: তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মাত্র ৩০ থেকে ৩৯ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের হিসেব এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, শুধু ৩১শে আগস্টের বিকেলেই লাঠির আঘাতে ও রক্তক্ষরণে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৮০ জন মানুষ!

  • পরবর্তী দিনগুলির তাণ্ডব: ১লা থেকে ৩রা সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুলিশ সারা বাংলায় অন্তত ৩০টি জায়গায় গুলি চালায়। সব মিলিয়ে এই আন্দোলন কেড়ে নেয় ৮০ থেকে ১১২ জন নিরপরাধ মানুষের প্রাণ

  • নিখোঁজ ও পৈশাচিকতা: ৩,০০০-এর বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০০-র বেশি মানুষকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে পুলিশ বেওয়ারিশ লাশ তুলে নিয়ে গিয়ে গঙ্গা ও বাগবাজার খালে ভাসিয়ে দিয়েছিল।

  • অগণিত গ্রেপ্তার: আন্দোলন দমন করতে ৪,০০০ থেকে ৭,০০০ মানুষকে শ্রীঘরে বন্দি করা হয়।

৭৫ বছরের বৃদ্ধ চুনিলাল দত্ত কিংবা ১৪ বছরের নাবালকের বুক ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল রাজপথে। শিবপুরের হারাধন পাল যখন গায়ে তেল মেখে পুকুরে নামছিলেন, তখন পুলিশের গুলি তাঁর বুক ভেদ করে চলে যায়। ছেলের রক্তাক্ত নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে কান্না ভেঙে পড়া মাকে সহ সন্তানকে চাদরে মুড়ে টেনে গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ।




৪. রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে স্মৃতির মিনার

পরদিন ১লা সেপ্টেম্বর, ছাত্রদের ডাকা ধর্মঘটে গোটা বাংলা স্তব্ধ হয়ে গেল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ছাত্ররা ব্যারিকেড গড়ে তুলল। সেদিন প্রতিটি বাঙালি বুঝেছিল— ব্রিটিশ তাড়িইয়ে যে 'স্বাধীনতা' এসেছে, তা শ্রমজীবী মানুষের পেটে ভাত দিতে পারেনি।

পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর কলকাতার সুবোধ মল্লিক স্কয়ারে (ওয়েলিংটন স্কয়ার) স্থাপন করা হলো শহীদ স্মারকের ভিত্তিপ্রস্তর। সেই থেকে প্রতি বছর ৩১শে আগস্ট পালিত হয়ে আসছে 'খাদ্য আন্দোলনের শহীদ দিবস'

১৯৫৯ সালের এই খাদ্য আন্দোলন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক লড়াই ছিল না; এটি ছিল এক মুঠো ভাতের দাবিতে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া বাংলার মেহনতি মানুষের আত্মত্যাগের মহাকাব্য। যে আন্দোলনের রক্তে ধুয়ে মুছে তৈরি হয়েছিল বাংলার রাজনীতির নতুন পটভূমি, আজ ৬৭ বছর পর ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে সেই শহীদদের রক্তবিন্দু আমাদের মনে করিয়ে দেয়— সরকারের নীতি যখন জনবিরোধী হয়, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল।

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies