আজ ২৯ আগস্ট, জাতীয় ক্রীড়া দিবসের দীপ্ত সকালে দুর্গাপুরের খেলার মাঠ সাক্ষী থাকল এক বুকজোড়া আবেগের। কোনো পেশাদার আলোর ঝলকানি ছিল না, ছিল না কোনো দামি বুটের মচমচে শব্দ—ছিল কেবল স্থানীয় বস্তি অঞ্চলের বুক থেকে উঠে আসা কিছু খুদের খালি পায়ের অদম্য লড়াই। ‘স্ফুলিঙ্গ সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংস্থা’র উদ্যোগে এবং ৫৪তম শহীদ ষড়ানন মুখার্জি ও শহীদ সুনীল আচার্য্য স্মৃতি ফুটবল প্রতিযোগিতা টুর্নামেন্ট কমিটির পরিচালনায় আজ আয়োজন করা হয়েছিল এক অনন্য প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। চরম অভাব ও প্রতিকূলতায় বেড়ে ওঠা, অবহেলিত অনূর্ধ্ব-১৪ বয়সের স্থানীয় বস্তি অঞ্চলের শিশুদের মুখে একটু আনন্দ ও হাসি ফোটাতেই ছিল এই সামাজিক ও মানবিক প্রয়াস।
বুকের ভেতর লড়াইয়ের আগুন, পায়ে স্বপ্নের বল
মাঠে বল গড়ানোর আগেই আবহ তৈরি হয়ে গিয়েছিল এক অদ্ভুত ভালোবাসার। বস্তির অন্ধকার গলি থেকে আসা এই খুদে খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করতে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান প্রাক্তন বিধায়ক শ্রী সন্তোষ দেবরায়, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক শ্রী সুখময় বোস, টুর্নামেন্ট কমিটির সম্পাদক শ্রী শেখর মুখার্জি এবং ক্রীড়া সংগঠক সুবিমল সেনগুপ্ত। তাঁদের স্নেহের পরশ ও উষ্ণ করমর্দনে এক নিমেষে মুছে গিয়েছিল বস্তির চেনা লড়াকু শৈশবের ক্লান্তি। প্রতিটি অবহেলিত মুখের চোখে তখন ফুটে উঠেছিল বিশ্বজয়ের আত্মবিশ্বাস।
বস্তি অঞ্চলের এই খুদেদের নিয়ে গঠিত তিনটি দলের (এ, বি এবং সি) মধ্যে ফুটবলের লড়াইটা শুধুই হার-জিতের ছিল না; তা ছিল অভাবের শিকল ভেঙে মুক্ত আকাশে ডানা মেলার এক উৎসব:
- প্রথম ম্যাচ: টানটান উত্তেজনায় এ টিম ২-১ গোলে বি টিমকে পরাস্ত করে নিজেদের অদম্য দক্ষতা প্রমাণ করে।
- দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত ম্যাচ: সব বাধা পেরিয়ে সি টিম ১-০ গোলে বি টিমকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নের ট্রফিটি নিজেদের বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে।
নারীশক্তির ছোঁয়ায় অনুভূতির পূর্ণতা
সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত তৈরি হয় যখন দুর্গাপুর রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের মহিলা রেফারি সুমিত্রা কিস্কু হুইসেল হাতে মাঠে নামেন। শক্ত হাতে খেলা পরিচালনা করার পাশাপাশি তাঁর প্রতিটি বাঁশি ও নির্দেশ যেন বস্তির এই ছোট ছোট ছেলেদের জীবনযুদ্ধে শৃঙ্খলা ও অনুশাসনের সঙ্গে এগিয়ে চলার নতুন পাঠ দিয়ে গেল।
আজকের এই জাতীয় ক্রীড়া দিবসে শহীদদের স্মৃতি কেবল স্মারক স্তম্ভে আটকে থাকেনি, তা বেঁচে উঠেছে বস্তি অঞ্চলের এই সুবিধা-বঞ্চিত শিশুদের গায়ের ঘামে, চওড়া হাসিতে আর ফুটবলের অনাবিল আনন্দে। বিজয়ী সি টিমের হাতের ট্রফিটা আজ শুধুই ধাতুর কোনো টুকরো ছিল না; ওটা ছিল বস্তির অন্ধকার পেরিয়ে তাদের আগামী দিনের আলোয় ফেরার প্রথম মজবুত সিঁড়ি।





