বিশেষ প্রতিবেদন, ভিউজ নাউ (VIEWS NOW):
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ভগত সিং শুধু একটি নাম নয়, আত্মত্যাগ ও বৈপ্লবিক ভাবনার এক চিরন্তন প্রতীক। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ মাত্র ২৩ বছর বয়সে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন এই তরুণ বিপ্লবী। তবে কেবল সশস্ত্র সংগ্রামই নয়, তাঁর মুক্তচিন্তা, সমাজ বিশ্লেষণ এবং যুক্তিবাদী মানসিকতা আজও সমসাময়িক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্প্রতি লাহোর জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় তাঁর লেখা ঐতিহাসিক নিবন্ধ ‘হোয়াই আই অ্যাম অ্যান অ্যাথিস্ট’ (Why I am an Atheist)-এর মূল ভাবভাবনা নতুন করে রাজনৈতিক ও দার্শনিক চর্চার কেন্দ্রে এসেছে।
অহংকার নয়, যুক্তির সত্য প্রকাশ
কারাগারে থাকাকালীন সহযোদ্ধা ও শুভানুধ্যায়ীদের একাংশ ভগৎ সিং-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন যে বিপ্লবী হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার পরই নাকি তিনি ‘অহংকারী’ হয়ে উঠেছেন এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। এই অভিযোগের স্পষ্ট উত্তর দিতেই তিনি কলম ধরেছিলেন।
ভগৎ সিং তাঁর লেখায় স্বীকার করেন যে তিনি মানুষ হিসেবে নিখুঁত নন, কিন্তু তাঁর নাস্তিকতার পেছনে কোনো ব্যক্তি-অহংকার কাজ করেনি। তিনি স্পষ্ট জানান, বৈপ্লবিক ভাবনার মূল ভিত্তিই হলো অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা।
বিশ্বাসের পরিবর্তন ও প্রশ্ন তোলার অধিকার
ভগৎ সিং-এর শৈশব কেটেছিল গভীর সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশে। লাহোরের ডিএভি স্কুলে পড়ার সময় নিয়মিত প্রার্থনা ও গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতেন তিনি। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শোষণ এবং গভীর গ্রন্থ পাঠ তাঁর চিন্তায় বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটায়।
- অধ্যয়ন ও প্রশ্ন: ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব ও রাজনৈতিক তত্ত্ব পাঠের মাধ্যমেই তিনি বুঝতে পারেন যে মানব সভ্যতার প্রতিটি অগ্রগতির মূলে রয়েছে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা।
- প্রশ্নাতীত সত্যের বিরোধিতা: তিনি বিশ্বাস করতেন, বহু বছর পুরনো বা সংখ্যাগরিষ্ঠের গৃহীত ধারণাও যদি যুক্তির পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়, তবে তা বর্জন করাই প্রগতির লক্ষণ।
সামাজিক অসাম্য ও ধর্মের মনস্তাত্ত্বিক রূপ
পৃথিবীতে অন্যায়, দারিদ্র্য, অনাহার এবং নিরীহ মানুষের ওপর ব্রিটিশ শাসনের নির্যাতনের বাস্তব রূপ দেখে ভগৎ সিং প্রচলিত ‘কর্মফল তত্ত্ব’ এবং ‘ঐশ্বরিক বিচার’-এর ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাঁর মতে:
- মানুষ প্রায়শই নিজের অসহায়ত্ব, ভয় ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা থেকে অতিপ্রাকৃতিক শক্তিতে মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয় খোঁজে।
- কোনো বিশ্বাস মানুষকে মানসিক সান্ত্বনা দিতে পারে, কিন্তু তা দিয়েই সেই বিশ্বাসের বাস্তব সত্যতা প্রমাণিত হয় না।
তিনি ফাঁসির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কোনো অলৌকিক ক্ষমতার ওপর আস্থা না রেখে কঠোর বাস্তবতাকে হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন।
ভিউজ নাউ-এর দৃষ্টিভঙ্গি: আজকের প্রেক্ষাপটে বার্তা
| মূল বিষয় | ভগৎ সিং-এর দর্শন | বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা |
| বিপ্লবের প্রধান অস্ত্র | বোমা বা পিস্তল নয়, বরং ‘স্বাধীন চিন্তা ও সমালোচনা’। | গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় মুক্ত চিন্তার প্রয়োজনীয়তা। |
| নৈতিকতার ভিত্তি | স্বর্গ/নরকের ভয় নয়, মানুষের নিজস্ব বিবেক ও মানবিকতা। | নিঃস্বার্থ সামাজিক দায়িত্ববোধের বিকাশ। |
| স্বাধীনতার সংজ্ঞা | কেবল রাজনৈতিক বা শাসনগত মুক্তি নয়, মানসিক কুসংস্কার থেকে মুক্তি। | বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিনির্ভর সমাজ নির্মাণ। |
ভিউজের বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি মানসিক ও বৈचारिक স্বাধীনতার যে বার্তা ভগৎ সিং দিয়ে গিয়েছিলেন, তা বর্তমান সময়ের যেকোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।


