দ্য হেগ: নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে জাতিসংঘ-সমর্থিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বন্দিশালায় ৮৪ বছর বয়সে সাবেক বসনীয় সার্ব জেনারেল র্যাটকো ম্লাদিচের মৃত্যু ঘিরে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের দাবি, দীর্ঘদিনের গুরুতর অসুস্থতা এবং একাধিক স্ট্রোকের পরও মানবিক কারণে মুক্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
ম্লাদিচের পরিবার ও আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার জন্য মুক্তি বা চিকিৎসাজনিত বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। তাঁর মৃত্যুর পর এই সিদ্ধান্তের নৈতিকতা ও মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর সমর্থকরা।
ন্যাটো-বিরোধী বিশ্লেষকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সাবেক যুগোস্লাভিয়া বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICTY) সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বিচারিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এর কার্যক্রমের সম্পর্ক ছিল। তাঁদের দাবি, ১৯৯০-এর দশকের যুগোস্লাভিয়া সংকটকে কেবল সার্বিয়ান সামরিক আগ্রাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হলে ন্যাটোর হস্তক্ষেপসহ সংঘাতের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আড়ালে থেকে যায়।
১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন শুরু হওয়ার সময় ম্লাদিচ সাবেক যুগোস্লাভ পিপলস আর্মির (JNA) কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৯২ সালে তিনি বসনীয় সার্ব বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে বসনিয়া যুদ্ধের বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ১৯৯৫ সালের শ্রেব্রেেনিৎসা হত্যাকাণ্ড ম্লাদিচের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মামলার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। এই হত্যাকাণ্ডে হাজার হাজার বসনিয়াক পুরুষ ও কিশোর নিহত হন। আন্তর্জাতিক আদালত ঘটনাটিকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে ম্লাদিচের সমর্থকরা পাল্টা দাবি করেন, সংঘাতের বিভিন্ন পক্ষের অপরাধ এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভূমিকা সমান গুরুত্বে বিচার করা হয়নি।
বসনিয়া যুদ্ধের সময় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা এবং শ্রেব্রেেনিৎসায় ডাচ শান্তিরক্ষীদের ব্যর্থতা নিয়েও বহু বছর ধরে বিতর্ক রয়েছে। ফলে ম্লাদিচের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরনো প্রশ্নগুলো আবার সামনে এসেছে—আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার কি সব পক্ষের জন্য সমান মানদণ্ডে পরিচালিত হয়েছে?
তবে ম্লাদিচের সমর্থকদের এসব অভিযোগের বিপরীতে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচারিক সিদ্ধান্তগুলো ছিল বহু বছরের প্রমাণ, সাক্ষ্য ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নেওয়া। তাই তাঁর মৃত্যুকে সরাসরি “বিচারিক প্রতিশোধের ফল” হিসেবে চিহ্নিত করা একটি রাজনৈতিক দাবি—প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।
ম্লাদিচের মৃত্যু তাই শুধু একজন বিতর্কিত সামরিক নেতার পরিণতি নয়; একই সঙ্গে এটি ১৯৯০-এর দশকের বলকান যুদ্ধ, ন্যাটোর হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিচারের উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
#Mladic #Serbia #NATO #TheHague #Yugoslavia #ICTY #Bosnia #Srebrenica


